বিশ্বের সবচেয়ে সুন্দর জলে-ডোবা মানুষ
অনুবাদ: অজয় গুপ্ত
বাচ্চাদের মধ্যে যারা প্রথমে সাগরের ওপর দিয়ে কালো ফুলে ওঠা জিনিসটাকে ধীরে-ধীরে ভেসে আসতে দেখেছিলো, ভেবেছিলো বুঝি শত্রুপক্ষের কোনো জাহাজ। পরে তারা দেখতে পেলো ওর কোনো নিশান বা মাস্তুল নেই, তখন তারা ভাবলো ওটা তিমিমাছ। কিন্তু জিনিসটা যখন ঢেউয়ের দোলায় কূলে এসে পড়লো, তারা সামুদ্রিক আগাছার ঝাড়, জেলিফিশের, মাছের আর সমুদ্রে ভেসেবেড়ানো জিনিসের টুকিটাকি তার গা থেকে সরিয়ে ফেললো, আর তখনই কেবল তারা দেখতে পেলো, ওটা একজন ডুবে-যাওয়া মানুষ।
সারাটা বিকেল তারা তার সঙ্গে খেলা করলো, বালির নিচে তাকে কবর দিলো, কবর খুঁড়ে আবার তাকে তুললো, সেইসময় কেউ একজন হঠাৎ তাদের দেখে ফেললো আর খবরটা গাঁয়ে রটিয়ে দিলো। যারা তাকে সবচেয়ে কাছের বাড়িটায় ব’য়ে নিয়ে এলো, লক্ষ করলো, তাদের জানা যে-কোনো মৃত মানুষের চেয়ে এই দেহটা বেশি ভারি, প্রায় একটা ঘোড়ার সমান। আর তারা নিজেদের মধ্যে বলাবলি করলো, হয়তো অনেকক্ষণ ধ’রে জলের ওপর ভেসে ছিলো আর তাই জল একেবারে হাড়ের মধ্যে ঢুকে গেছে। তাকে মেঝেতে শুইয়ে দিয়ে তারা বললো, অন্য সব মানুষের চেয়ে সে লম্বা। কারণ বাড়িটায় তার জন্য আর খুব অল্পই জায়গা অবশিষ্ট ছিলো। কিন্তু তারা ভাবলো মৃত্যুর পরেও বেড়ে চলার ক্ষমতা হয়তো কোনো-কোনো জলে-ডোবা মানুষের প্রকৃতির একটা অঙ্গ। তার সারা গায়ে সমুদ্রের গন্ধ আর আকৃতি থেকেই কেবল বোঝা যাচ্ছিলো যে এটা মানুষের শব, কারণ কাদা আর আঁশের আবরণে তার চামড়া ঢাকা প’ড়ে গিয়েছিলো।
মৃত মানুষটি যে অপরিচিত তা জানতে তার মুখটাও তাদের সাফ করার দরকার হলো না। সারা গাঁয়ে মোটে গোটা-কুড়ি কাঠের বাড়ি, যার পাথুরে উঠোনে কোনো ফুল ফোটে না আর গ্রামটি একটি মরুভূমির মতো অন্তরীপের একেবারে শেষ পর্যন্ত ছড়ানো। জমি এতই কম ছিলো যে মায়েদের মনে সবসময়েই ভয়, বুঝি বাতাস উড়িয়ে নিয়ে যাবে তাদের বাচ্চাদের আর তাদের মধ্যে বুড়ো হয়ে যে ক-কজন মারা গেছে, তাদের পর্বতের খাড়াই থেকে ছুঁড়ে ফেলে দিতে হয়েছে। কিন্তু সাগর শান্ত আর দরাজ, আর সাতটি নৌকোতেই সব লোক ধ’রে যেতো। কাজেই তারা যখন জলে-ডোবা মানুষটিকে দেখলো, শুধু নিজেদের মধ্যে চোখ চাওয়া-চাওয়ি করে দেখে নিলো যে তারা সবাই সেখানে রয়েছে।
সে-রাতে তারা সাগরে গেলো না কাজে। যখন পুরুষরা দেখতে বেরুলো আশেপাশের গাঁয়ের কেউ নিখোঁজ হয়েছে কি-না, মেয়েরা থেকে গেলো জলে-ডোবা মানুষটির যত্ন-আত্তি করবার জন্য। তারা ঘাসের তৈরি ঝাড়ন দিয়ে মাটি ঝেড়ে ফেললো, জলের নিচের যে-সব নুড়ি তার চুলে জড়িয়ে গিয়েছিলো সেগুলো সরিয়ে দিলো আর মাছের আঁশ ছাড়াবার ঝিনুক দিয়ে তার গা থেকে শ্যাওলা চেঁছে ফেললো। কাজ করতে করতে তাদের নজরে পড়লো, তার গায়ে যে-সব গাছপালা সেগুলো বহুদূর সমুদ্রের আর গভীর জলের, আর তার পোশাক শতচ্ছিন্ন, যেন প্রবালের গোলক- ধাঁধার পথ উজিয়ে এসেছে। তারা এ-ও দেখলো, মৃত্যুকে সে বহন করেছে খুবই মর্যাদার সঙ্গে, কারণ সাগর থেকে ফেরা অন্য ডুবন্ত মানুষদের মতো তার দৃষ্টি নির্জন নয়, বা নদীতে যারা ডুবে যায় তাদের মতো বন্য, নিঃস্ব ও নয়। কিন্তু তাকে সাফ করার কাজ শেষ করার পরেই তারা বুঝতে পারলো মানুষটি কেমন ছিলো, আর বুঝতে পারামাত্রই তাদের দম আটকে এলো। সে কেবল সবচেয়ে দীর্ঘকায়, সবচেয়ে শক্তিশালী, অত্যন্ত পৌরুষপুর্ণ এবং তাদের দেখা সবচেয়ে সুপুরুষই নয়, যদিও তারা তাকেই দেখছিলো, তবু তাদের কল্পনাতেও এমন মানুষের স্থান ছিলো না।
তাকে শোয়ানোর মতো বড়ো বিছানা তারা সারা গাঁয়ে খুঁজে পেলো না, পেলো না এমন কোনো পোক্ত টেবিল যা তার উপাসনার জন্য ব্যবহার করা চলে। সবচেয়ে লম্বা মানুষদের হলিডে প্যান্ট
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
এক মাস
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).


Comments